ছোটবেলায় বর্ণমালা শেখার পর আমরা কার শিখি। ওই বয়সে আমাদের বুঝে শেখার ক্ষমতা থাকে না, তাই কিছু ভুল ধারণা থেকে যায়। এই ভুল সংশোধন করে নিতে পারলে বাংলা শেখা সহজ হয়ে যাবে।
বাংলা স্বরধ্বনি যখন অন্য বর্ণ বা ধ্বনির সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তার পুরোটা ব্যবহৃত হয় না। তার একটা চিহ্ন বা প্রতীক ব্যবহৃত হয়। এই চিহ্ন বা প্রতীককে কার বলা হয়। বাংলা স্বরবর্ণ রয়েছে ১১ টি। অ-এর কোনও চিহ্ন বা অ-কারের ব্যবহার নেই। অতএব বাংলায় রয়েছে মোট ১০ টি কার।
অ-কার চিহ্ন নেই। আমরা এমনিতে বুঝে নিই যে অ-ধ্বনি ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন, 'বলদ' শব্দটিতে প্রথম ও মধ্যের ধ্বনির সঙ্গে অ-ধ্বনি আছে, অন্তে অ-ধ্বনি উহ্য বা নেই, বলদ = ব্+অ+ল্+অ+দ্। কিন্তু প্রিয়, পূর্ণ ইত্যাদি শব্দের অন্তে অ-ধ্বনির ব্যবহার আছে, প্রিয় = প্+র্+ই+য়্+অ । এই নিয়ম বোঝাতে কোনও কার ব্যবহৃত হয় না।
অন্যান্য স্বরবর্ণ ও তার পরিচায়ক কার নিচে রইলঃ
আ = আ-কার = া
ই = ই-কার = ি
ঈ = ঈ-কার = ী
উ = উ-কার = ু
ঊ = ঊ-কার = ূ
ঋ = ঋ-কার = ৃ
এ = এ-কার = ে
ঐ = ঐ-কার = ৈ
ও = ও-কার = ো
ঔ = ঔ-কার = ৌ
ক্ ধ্বনির সঙ্গে স্বরধ্বনির ব্যবহারঃ
ক্+আ=কা
ক্+ই=কি
ক্+ঈ=কী
ক্+উ=কু
ক্+ঊ=কূ
ক্+ঋ=কৃ
ক্+এ=কে
ক্+ঐ=কৈ
ক্+ও=কো
ক্+ঔ=কৌ
কার ও তার ব্যবহার সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত এই বর্ণনা আশা করি কাজে লাগবে। এর সুত্র ধরে একটু চর্চা করলে বাকিটাও আয়ত্তে এসে যাবে।
ব্যঞ্জনবর্ণে রয়েছে 'ক' থেকে 'ঁ' পর্যন্ত। ব্যঞ্জনধ্বনি উচ্চারণের ক্ষেত্রে স্বনির্ভর নয়. স্বরধ্বনির সহায়তা ছাড়া বলতে গেলে তার অস্তিত্বই নেই। অর্থাৎ স্বরধ্বনি ছাড়া ব্যঞ্জনধ্বনি উচ্চারণ সম্ভব নয়। ব্যঞ্জনধ্বনি বোঝাতে হস্ (্) চিহ্ন ব্যবহার করা হয়।
ক্ উচ্চারণ সম্ভব নয়। সেই জন্যে এর আগে বা পরে স্বরধ্বনি লাগাতে হয়, যেমন ক্ + অ = ক, অ + ক্ = অক্। এইভাবে ইক্, কি, উক্, কু ইতাদি।
ব্যঞ্জনবর্ণমালা সাজানো হয়েছে প্রতিটি সারিতে পাশাপাশি পাঁচটি করে বর্ণ বসিয়ে। এভাবে রয়েছে আটটি সারি। পাশাপাশি বা উপরনিচ সন্নিবিষ্ট বর্ণের রয়েছে কিছু সমধর্ম। এ নিয়ে কিছু প্রাথমিক আলোচনা করা যায়।
ক-বর্গ -- কখ গ ঘ ঙ -- কণ্ঠ্য বর্ণ
চ-বর্গ -- চছ জ ঝ ঞ -- তালব্য বর্ণ
ট-বর্গ -- ট ঠ ড ঢ ণ -- মূর্ধন্য বর্ণ
ত-বর্গ -- ত থ দ ধ ন -- দন্ত্য বর্ণ
প-বর্গ -- প ফ ব ভ ম -- ঔষ্ঠ বর্ণ
কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত হয় কণ্ঠ্যবর্ণ, অর্থাৎ জিহ্বার গোড়ার অংশ স্পর্শ হয় কণ্ঠে। তালু স্পর্শ করে উচ্চারিত হয় বলে এদের তালব্য বর্ণ বলা হয়, জিহ্বার মধ্যভাগ তালুতে লাগে। মূর্ধায় জিহ্বার অগ্রভাগ স্পর্শ হয়ে উচ্চারিত হয় মূর্ধন্য বর্ণ। দাঁতে জিহ্বার অগ্রভাগ লেগে উচ্চারিত হয় দন্ত্য বর্ণ। ঠোঁট বা ওষ্ঠ-অধরের স্পর্শে উচ্চারিত হয় ঔষ্ঠ্য বর্ণ।
এর পর রয়েছে
য র ল ব শ
ষ স হ ড় ঢ়
য় ৎ ং ঃ ঁ
য, র, ল, ব, য় হলো অন্তঃস্থ বর্ণ। শ তালব্য বর্ণের গোত্রের। ষ, ড়, ঢ় মূর্ধন্য বর্ণ। হ কণ্ঠ্য বর্ণ। তবে শ, ষ, স, হ উষ্ম বর্ণ হিসেবেও পরিগণিত। ৎ, ং, ঃ হসন্ত বর্ণ , অর্থাৎ হস্ অন্ত 'ত' = ৎ, হস্ অন্ত ঙ = ং এবং হস্ অন্ত হ = ঃ এবং ঁ হলো পরাশ্রয়ী বর্ণ।
ণ-এর উচ্চারণ বাংলায় নেই, তৎসম শব্দের বানানে রয়ে গেছে। স-এর উচ্চারণও বাংলায় নেই বললেই চলে। অন্তঃস্থ ব-এর ব্যবহার আছে যদিও ঔষ্ঠ্য ব-এর সঙ্গে তার পার্থক্য নেই, তাই একটিকে বাদ দিলেই হলো।
ব্যঞ্জনবর্ণ নিয়ে এই আলোচনা আপাতত এই পর্যন্ত থাকল। নিচের ইউটিউব ভিডিওটি বুঝতে আরও সাহায্য করবে। পরে প্রয়োজনে আরও কিছু আলোচনা করা যাবে।
ভাষা
শিক্ষার একদম প্রথম সিঁড়ি হল বর্ণমালা। আমরা এখান থেকেই শুরু করি। অর্থাৎ এক্কেবারে
অ, আ, ক, খ থেকে যাত্রা শুরু। অবহেলা করবেন না। আপনি যদি ‘হ্রস্ব ই’ কে ‘রসই’ বলেন
বা লেখেন তাহলে আপনাকে এখান থেকেই শুরু করতে হবে। আর যারা গোড়ায় গলদ দুর করতে চান,
(ছাত্র, অভিভাবক, শিক্ষক, সাংবাদিক, ফেসবুককর্মী) তাঁদের অবশ্যই মনোযোগ দেওয়া উচিত।
বর্ণ
আর অক্ষর কিন্তু এক নয়। অক্ষর হল ইংরাজিতে যাকে বলে syllable, অর্থাৎ একসঙ্গে যতটুকু
উচ্চারিত হয়। যেমন, অজ্ঞতা=অগ্+গ+তা। তিনটি অক্ষর বা syllable রয়েছে ‘অজ্ঞতা’ শব্দটিতে।
বর্ণ
আর ধ্বনিও কিন্তু এক নয়। ধ্বনি হল শুধুমাত্র আওয়াজ (sound)। আর বর্ণ হল সেই ধ্বনির
নাম। যেমন, ‘ই’ একটি ধ্বনি, একে একটু বেশি সময় উচ্চারণ করলে ‘ঈ’ হয়। ‘ই’ হল ধ্বনি,
‘হ্রস্ব ই’ হল বর্ণ, ‘ঈ’ হল ধ্বনি, ‘দীর্ঘ ঈ’ হল বর্ণ।
বাংলায়
মোট ৫০ টি বর্ণ রয়েছে বর্তমানে। এর মধ্যে ১১ টি হল স্বরবর্ণ এবং ৩৯ টি ব্যঞ্জনবর্ণ।
স্বরবর্ণ
অ আ ই ঈ
উ ঊ ঋ ৯
এ ঐ ও ঔ
এখানে
রয়েছে মোট ১২ টি স্বরবর্ণ। এর মধ্যে ৯ (হ্রস্ব লি) এর ব্যবহার বাংলায় নেই, তাই এটাকে
বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে বাংলায় এখন রয়েছে ১১ টি স্বরবর্ণ।
স্বরবর্ণকে
তিন ভাগে ভাগ করা যায়।
হ্রস্বস্বরদীর্ঘ স্বর যৌগিক স্বর
অআঐ
ইঈঔ
উঊ
ঋএ
ও
‘অ’
যেহেতু আরেকটি নেই, হ্রস্ব বলার দরকার নেই। ‘আ’র ক্ষেত্রেও তা’ই। একই পাড়ায় দু’জন বসির
থাকলে একজনকে লম্বা বসির, আরেকজনকে বেঁটে বসির বলা হয়। ই (e) দু’টি আছে, তাই একটি হ্রস্ব,
আরেকটি দীর্ঘ। উ/ঊ-র ক্ষেত্রেও তাই। ঋ একটি, কিন্তু তাকে হ্রস্ব বলা হয়, কারণ দীর্ঘ
রি ও দীর্ঘ লি বলে দু’টি বর্ণ ছিল। এ, ও দীর্ঘ স্বর। ঐ=ও+ই, ঔ=ও+উ – দু’টি স্বর যোগ
হয়ে এই স্বর, তাই এগুলো যৌগিক। পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা বর্ণমালা থেকে
ৠ
(দীর্ঘ রি), ৡ (দীর্ঘ লি) বাদ দেন, কারণ বাংলায় এগুলোর ব্যবহার নেই। ‘অ৹’ ও ‘অঃ’
কে স্বরবর্ণ থেকে সরিয়ে ব্যঞ্জনবর্ণে স্থান দেন ং ও ঃ রূপে এবং তাঁর সঙ্গে জুড়ে
দেন ৺ । এছাড়াও ড়, ঢ়, য় এই তিনটি ব্যঞ্জনবর্ণ যোগ করেন। তারপর দেড়শ’ বছরে
শুধুমাত্র ৯ (হ্রস্ব লি)-টাই সরেছে বাংলা থেকে।
বাংলায় দীর্ঘস্বর নেই বললেই
চলে। একাক্ষরযুক্ত শব্দে ‘আ’ সামান্য দীর্ঘ হয়, যেমন গান, স্বাদ, মা, না ইত্যাদি। অন্যান্য
ধ্বনির ক্ষেত্রেও এরকম ব্যতিক্রম আছে। এই সব বিবেচনা করে তৎসম শব্দ ছাড়া অন্য
শব্দে দীর্ঘস্বরের ব্যবহার এখন নেই। তৎসম শব্দের বানান পরিবর্তন না করার ফরমান
রয়েছে। কিন্তু এতে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে বানানের ক্ষেত্রে। আর এই সমস্যা
অনেককেই বাংলা লেখালেখি থেকে দুরে সরিয়ে রেখেছে। যা একটি ভাষার আয়ুর পক্ষে হুমকি
স্বরূপ। বর্তমান সময়ে এই বাছবিচার থেকে মুক্তির চেষ্টা চলছে।
স্বরবর্ণ সম্পর্কে আরও অনেক কিছু
বলার রয়েছে। তবে আপাতত এটুকুই যথেষ্ট। পরবর্তী পর্বে আমরা আলোচনা করব ব্যঞ্জনবর্ণ
নিয়ে। আপনাদের কোনও ব্যাপারে অমত থাকলে মন্তব্য করে সংশোধনের সুযোগ দেবেন। ধন্যবাদ
সবাইকে।
Friday, September 17, 2021
ইলিশ মাছ খেতে হলে তার কাঁটা বাছতে হবে। পদ্ম তুলতে হলেও তাই। আর কোনও কিছু শিখতে হলে কষ্ট তো করতেই হয়। গান শিখবেন আর রেওয়াজ করবেন না, তা কী করে হয়? অন্যান্য ভাষার মতো বাংলা শিখতেও একেবারে গোড়া থেকে আরম্ভ করতে হবে।
মনে হতে পারে এ আবার কী! এখন আবার অ, আ শিখতে হবে নাকি?
আলবাৎ শিখতেই হবে। অ-আ না শিখে বাংলা শিখবেন কী করে?
অ , আ জানি না ভাবছেন?
হ্যাঁ, অ-আ জানেন না আপনি।
তাহলে পরীক্ষা হয়ে যাক। পারলে তো ভালোই। না পারলে শিখতে তো হবেই।
ই, উ, ঋ বানান করে লিখুন তো।
স, ষ, শ বানান করে লিখুন তো।
বর্ণমালায় 'ব' ২টা কেন?
ড়, ঢ় বানান করে লিখুন।
এই চারটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নিন। আগামি দিন আবার দেখা হবে উত্তর নিয়ে।